পল কাপুর, সার্জিও গোর, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন: যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দক্ষিণ–এশিয়া কূটনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন–
গতকাল থেকে সোশাল মিডিয়ায় দেখছি একটি শিরোনাম “ ঢাকায় আসছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত।“ গত কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় আসবেন। তার আগে শোনা গিয়েছিলো সার্জিও গোর, যিনি ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত তিনি দক্ষিণ এশিয়ারও বিশেষ দায়িত্বে- হয়তো ঢাকায় আসতে পারেন। এরপর ঢাকার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন আসার অপেক্ষায়। কিন্তু কোনোটাই এখনও চূড়ান্ত না। এর সত্যতা খুঁজতে গিয়ে যা পেলাম।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, অস্থায়ী সরকারের ভূমিকা, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে ঢাকায় কখনও “বিশেষ দূত আসছেন” এমন গুজব ছড়াচ্ছে, আবার কখনও সম্ভাব্য কূটনৈতিক সফরের আলোচনাও বাড়ছে।
কিন্তু সত্যটা কী?
যুক্তরাষ্ট্রের কোন কর্মকর্তা আসলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন?
আর কার আগমন নিয়ে যে ধোঁয়াশা—সেটা কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে?
এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমরা তিনটি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পুরো চিত্রটি দেখি:
১) পল কাপুর (Paul Kapur) – যুক্তরাষ্ট্রের নতুন Assistant Secretary for South & Central Asian Affairs
২) ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন (Brent Christensen) – বাংলাদেশের পরবর্তী মার্কিন রাষ্ট্রদূত
৩) সার্জিও গোর (Sergio Gor) – ট্রাম্প প্রশাসনের Special Envoy for South & Central Asia
পল কাপুর: যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ–মধ্য এশিয়া নীতির প্রধান কর্মকর্তা—কিন্তু তিনি ঢাকায় কি আসছেন?
অক্টোবর ২০২৫-এ পল কাপুর শপথ নেন U.S. Assistant Secretary for South & Central Asian Affairs পদে।
এটি স্টেট ডিপার্টমেন্টের অন্যতম শক্তিশালী কূটনৈতিক দায়িত্ব—যার আওতায় পড়ে:
- বাংলাদেশ
- ভারত
- পাকিস্তান
- নেপাল
- ভুটান
- শ্রীলংকা
- আফগানিস্তান
- বিভিন্ন মধ্য এশিয়ার দেশ
অর্থাৎ, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক নীতি—কূটনীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাণিজ্য—সবকিছুই এই বিভাগের অধীনে।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—
কোনো বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমে এখনো পাওয়া যায়নি যে পল কাপুর ঢাকায় আসছেন বা সফর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রমাণ কী?
- গত দুই মাসের (অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৫) ৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক সংবাদ (AP, Reuters, Business Standard, The Diplomat, Dhaka Tribune) পর্যালোচনায় এমন কোনো সফর ঘোষণার চিহ্ন নেই।
- তার নিয়োগের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে; বাংলাদেশ সেখানে আলোচ্য হলেও সফরের ঘোষণা হয়নি।
তাহলে তার নাম কেন আলোচনায়?
কারণ—
তিনি যেকোনো সময় ঢাকা সফর করতে পারেন।
এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাণিজ্য সংকট ও রোহিঙ্গা ইস্যুর জন্য তার আগমন একটি যৌক্তিক কূটনৈতিক সম্ভাবনা।
কিন্তু এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য নেই।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন: বাংলাদেশের পরবর্তী মার্কিন রাষ্ট্রদূত—তিনি কি আসছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার।
হ্যাঁ — তিনি আসবেন।
কিন্তু এখনো আসেননি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনকে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন দেয়।
তার যোগ্যতা:
- তিনি আগে তাইওয়ান–এ U.S. Institute in Taiwan–এর পরিচালক
- ২০১৯–২০২১ সালে ঢাকা মিশনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর
- দক্ষিণ–এশিয়া কূটনীতিতে অভিজ্ঞ
তাহলে ঢাকায় কেন দেখা যাচ্ছে না?
কারণ—
রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রক্রিয়ায় কংগ্রেসের অনুমোদন, কূটনৈতিক ক্লিয়ারেন্স এবং দেশ–দ্বয়ের আনুষ্ঠানিক সমঝোতা লাগে।
এই প্রক্রিয়া সাধারণত ২–৪ মাস সময় নেয়, কখনও তার বেশি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসে এখনো তার:
- Senate confirmation
- agrément (বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্মতি)
—উভয় প্রক্রিয়ার তথ্য প্রকাশ পায়নি।
অর্থাৎ—
ক্রিস্টেনসেন নিযুক্ত হয়েছেন, কিন্তু দায়িত্ব নিতে এখনো ঢাকায় আসেননি।
তবে এটি নিশ্চিত—আসবেন।
সার্জিও গোর: ট্রাম্পের Special Envoy — গুজব কেন তার নাম ঘিরে?
যে “বিশেষ দূত” আসছেন বলে ঢাকায় গুজব ছড়িয়েছে—সেটি সম্ভবত সার্জিও গোর।
কারণ:
- তিনি South & Central Asia-এর জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের Special Envoy
- এই অঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকে
- নিউইয়র্কে UNGA চলাকালে তিনি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের সঙ্গে কথা বলেছেন
- ভারত সফরের আগমুহূর্তে অঞ্চলভিত্তিক কূটনীতি জোরদার করছেন
কিন্তু তিনি কি ঢাকায় আসছেন?
এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা নেই, তবে তার আগমনের সম্ভাবনা পল কাপুর বা ক্রিস্টেনসেনের চেয়ে বেশি—
কারণ তিনি সফর–নির্ভর কূটনৈতিক দায়িত্বে আছেন।
তার নামেই “special envoy” — ফলে সামাজিক মাধ্যমে “ট্রাম্পের বিশেষ দূত আসছেন” এমন প্রচার বেশি ছড়িয়েছে।
তাহলে কে আসছেন, কে আসছেন না
| কর্মকর্তা | পদ | নিশ্চিত তথ্য | ঢাকায় আসার অবস্থা |
| Paul Kapur | Assistant Secretary (South & Central Asia) | অত্যন্ত প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক | কোনো সফর ঘোষণা নেই |
| Brent Christensen | পরবর্তী US Ambassador to Bangladesh | মনোনয়ন নিশ্চিত | আসবেন, কিন্তু এখনও আসেননি |
| Sergio Gor | Special Envoy for South & Central Asia | বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা করেছেন | আসার সম্ভাবনা আছে, ঘোষণা নেই |
ঢাকায় সফরের সম্ভাবনা: সম্ভাব্য ৩টি দৃশ্যপট
দৃশ্যকল্প ১ — (সবচেয়ে সম্ভাব্য)
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন প্রথমে ঢাকায় আসবেন, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নিতে।
সেটি হতে পারে ডিসেম্বর ২০২৫ – মার্চ ২০২৬ এর মধ্যে।
দৃশ্যকল্প ২ — (মাঝারি সম্ভাবনা)
সার্জিও গোর আসবেন প্রথমে, কারণ তিনি অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ দূত এবং কূটনৈতিক মিশনে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করতে পারেন।
দৃশ্যকল্প ৩ — (কম সম্ভাবনা)
পল কাপুর কৌশলগত সফরে ঢাকায় আসতে পারেন, বিশেষ করে:
- রোহিঙ্গা সংকট
- ইন্দো–প্যাসিফিক বিষয়
- মার্কিন বাণিজ্য নীতি
এগুলোর কারণে, তবে এখনো কোনো ইঙ্গিত নেই।
গুজব, বাস্তবতা এবং কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী—
“ট্রাম্পের বিশেষ দূত ঢাকায় আসছেন”—এই দাবি এখনো নিশ্চিত নয়।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যে দক্ষিণ–এশিয়া কূটনীতিকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে—
তা স্পষ্ট।
তিনজন কর্মকর্তা—
Paul Kapur, Sergio Gor, এবং Brent Christensen—
তিনভাবে বাংলাদেশকে স্পর্শ করেন:
- একজন নীতিনির্ধারক
- একজন বিশেষ দূত
- একজন নতুন রাষ্ট্রদূত
এই ত্রয়ীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সামনের মাসগুলোতে আরও গভীর কূটনৈতিক যোগাযোগে যাবে—এটাই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।








Leave a Reply